অনলাইন ডেস্ক 1259
২০২৪: ষড়যন্ত্র, বিশ্বাসঘাতকতা ও বাংলাদেশের কঠিন সময়
২০২৪ সাল—এটি নিছক একটি পঞ্জিকার সাল নয়, বরং বাংলাদেশের ইতিহাসে এক সন্ধিক্ষণ, যেখানে জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকতা এবং আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র একত্রে জাতিকে অনিশ্চয়তার পথে ঠেলে দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট: আধুনিক সাম্রাজ্যবাদের নতুন কৌশল
২০২৪ সালের আন্তর্জাতিক রাজনীতি ছিল উত্তেজনাপূর্ণ ও নাটকীয়। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে পশ্চিমা শক্তির নতুন মোড় নেওয়া নীতিমালা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, আধুনিক উপনিবেশবাদ এখন আসে "সহযোগিতা" এবং "সহায়তা"-র নামে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের মধ্যকার সাম্প্রতিক চুক্তিটি তার বড় উদাহরণ, যেখানে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তার বিপরীতে ইউক্রেনের বিরল খনিজ সম্পদে কার্যত মার্কিন আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই নীতির পিছনে কাজ করছে কর্পোরেট স্বার্থ, সামরিক জোট এবং তথাকথিত "ডীপ স্টেট"।
এই কৌশল এখন দক্ষিণ এশিয়ার দিকে মুখ ফিরিয়েছে। বাংলাদেশ, যার ভৌগোলিক অবস্থান চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ এবং ভারত মহাসাগরীয় কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু, এখন হয়ে উঠেছে ভূ-রাজনৈতিক আগ্রাসনের সম্ভাব্য লক্ষ্য।
"মানবিক করিডোর" নাকি সামরিক প্রভাব?
রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের নিয়ে উদ্ভূত মানবিক সংকটকে পুঁজি করে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো "মানবিক করিডোর" তৈরির প্রস্তাব দিচ্ছে। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি আদতে একটি সামরিক চুক্তির ছদ্মবেশ, যা বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বিদেশি সামরিক উপস্থিতির দরজা খুলে দিতে পারে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্বে যেমন মার্কিন ঘাঁটি স্থাপনের বিনিময়ে সমর্থনের প্রস্তাব এসেছিল বঙ্গবন্ধুর কাছে, তেমনই এখনো একই রকম চাপ আসছে। বঙ্গবন্ধু সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, যার জন্য তাঁকে এবং তাঁর পরিবারকে চরম মূল্য দিতে হয়। আজ তার কন্যা শেখ হাসিনার উপরও তেমন চাপ এসেছে এবং তিনি আপস না করায় ২০২৪ সালে তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে সংঘটিত সহিংসতা এবং অস্থিরতা সেই আন্তর্জাতিক প্রতিশোধের রূপ বলে অনেকেই মনে করেন।
অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকতা ও নির্বাচন পরবর্তী রাজনৈতিক চিত্র
২০২৪ সালের নির্বাচনের পর গঠিত ইউনুছ সরকারকে অনেকেই বৈধ মনে করছেন না। দেশীয় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ছাড়িয়ে বিদেশি স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করা একটি সরকার এখন কার্যত ক্ষমতায়। ভোটারবিহীন নির্বাচন, বিরোধী দলকে দমন, সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে একটি একনায়কতান্ত্রিক কাঠামো। জনগণের ইচ্ছা বা মতামতের চেয়ে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ ও কর্পোরেট সংস্থার এজেন্ডাই এখন যেন দেশ পরিচালনার মূল চালিকাশক্তি।
ইউনুছ সরকারের ব্যর্থতা: একটি তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ
নবগঠিত ইউনুছ সরকারের কর্মকাণ্ড শুরু থেকেই বিতর্কিত। ক্ষমতায় আসার পর থেকেই এই সরকার একের পর এক ব্যর্থ নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং জনবিচ্ছিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে জনগণের আস্থা হারিয়েছে। নিচে তাদের প্রধান কয়েকটি ব্যর্থতা তুলে ধরা হলো:
- অর্থনৈতিক স্থবিরতা: মাত্র ৬ মাসেই টাকার মান ডলারের বিপরীতে রেকর্ড পরিমাণে পড়ে গেছে। বিদেশি বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে গেছে, এবং ব্যাংকিং খাতে নগদ সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে।
- দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা: চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য দ্বিগুণ হয়ে গেছে। বাজার মনিটরিং প্রায় নেই বললেই চলে।
- আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি: রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে ডাকাতি, খুন, ধর্ষণ এবং সন্ত্রাসের ঘটনা বেড়েই চলেছে। পুলিশ প্রশাসন কার্যত নিরব ভূমিকা পালন করছে।
- স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে অব্যবস্থা: চিকিৎসা খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে দ্বিগুণ। সরকারী হাসপাতালগুলোতে ওষুধ সংকট, চিকিৎসকের অনুপস্থিতি এবং দুর্নীতি নতুন রেকর্ড গড়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থায়ও একই রকম অব্যবস্থা চলছে—বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, শিক্ষক নিপীড়ন এবং নিয়োগে পক্ষপাতিত্ব স্পষ্ট।
- গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ: বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, সম্পাদকদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে, এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার বেড়েছে।
- বিদেশ নীতি ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে আপস: ভারতের সঙ্গে পানি চুক্তি না হওয়া সত্ত্বেও একতরফা পানি প্রত্যাহার চলছে। রাখাইন করিডোর ইস্যুতে কোনও শক্ত অবস্থান দেখা যায়নি সরকারের পক্ষ থেকে।
এই পরিস্থিতিতে অনেকেই আশঙ্কা করছেন, ইউনুছ সরকারের অব্যবস্থাপনা এবং বিদেশি স্বার্থে পরিচালিত নীতিমালা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ একটি গভীর সংকটে নিপতিত হতে পারে।

অর্থনীতি ও নিরাপত্তার অস্থিরতা
চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে দেশের অর্থনীতি মারাত্মক চাপে পড়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে এসেছে, আমদানি-রপ্তানি বিঘ্নিত, এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে গেছে। একই সঙ্গে সীমান্তে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নাজুক হয়ে উঠেছে, বিশেষত কক্সবাজার ও বান্দরবান এলাকায় আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অস্বাভাবিক তৎপরতা লক্ষণীয়।
করণীয় ও সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ
এই সংকটের সমাধানে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। প্রয়োজন স্বচ্ছ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ নেতৃত্ব, এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে শক্ত অবস্থান। জনসচেতনতা বৃদ্ধি, তথ্যপ্রযুক্তি ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, এবং তরুণ প্রজন্মের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এই ঘোর সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। বাংলাদেশ এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত দেশকে ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ে নিয়ে যেতে পারে—হোক তা গৌরবময় অথবা বিপর্যয়কর।
২০২৪ সাল তাই কেবল একটি বছর নয়; এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র ও ভবিষ্যতের জন্য একটি সতর্ক সংকেত, এক কঠিন চ্যালেঞ্জ এবং এক কলঙ্কিত অধ্যায়ের সূচনার প্রতীক।
সৈয়দ ইউসুফ তাকি
মন্ট্রিয়ল, কানাডা
পহেলা মে, ২০২৫
রাজনীতি রাজনীতি
এই বিভাগের আরও খবর
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে রাশিয়ার সমর্থন চাইল বাংলাদেশ
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে রাশিয়ার সমর্থন চাইল বাংলাদেশ
দেশজুড়ে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন, ১৬ মার্চ উদ্বোধন
দেশজুড়ে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন, ১৬ মার্চ উদ্বোধন
বিরোধীদলের ওয়াকআউট নিয়ে যা বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
বিরোধীদলের ওয়াকআউট নিয়ে যা বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
হট্টগোলের মধ্যে রাষ্ট্রপতির ভাষণ, প্ল্যাকার্ড হাতে বিরোধী দলের ওয়াক আউট
হট্টগোলের মধ্যে রাষ্ট্রপতির ভাষণ, প্ল্যাকার্ড হাতে বিরোধী দলের ওয়াক আউট
দ্বিগুণ দামে আরও ৩ কার্গো এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্ত
দ্বিগুণ দামে আরও ৩ কার্গো এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্ত
হরমুজ প্রণালিতে বাংলাদেশি জাহাজে বাধা না দেওয়ার খবরে স্বস্তি
হরমুজ প্রণালিতে বাংলাদেশি জাহাজে বাধা না দেওয়ার খবরে স্বস্তি
বিমানের মধ্যপ্রাচ্যের ৪ রুটের ফ্লাইট অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা
বিমানের মধ্যপ্রাচ্যের ৪ রুটের ফ্লাইট অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা
ওসমান হাদির হত্যাকারী ফয়সালসহ দু’জন ১৪ দিনের রিমান্ডে
ওসমান হাদির হত্যাকারী ফয়সালসহ দু’জন ১৪ দিনের রিমান্ডে
বাংলাদেশের উদ্দেশে এলএনজির প্রথম চালান জাহাজে তুলেছে কাতার
বাংলাদেশের উদ্দেশে এলএনজির প্রথম চালান জাহাজে তুলেছে কাতার
জ্বালানি তেল কেনার সীমা বেঁধে দিলো সরকার
জ্বালানি তেল কেনার সীমা বেঁধে দিলো সরকার
খালেদা জিয়াসহ ২০ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান পাচ্ছে স্বাধীনতা পুরস্কার
খালেদা জিয়াসহ ২০ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান পাচ্ছে স্বাধীনতা পুরস্কার
বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার পরামর্শ প্রধানমন্ত্রীর
বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার পরামর্শ প্রধানমন্ত্রীর

